নিআমত বৃদ্ধির ঐশী সূত্র: কৃতজ্ঞতা

🌿 নিআমত বৃদ্ধির ঐশী সূত্র: কৃতজ্ঞতা 🌿

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে একটি জীবনমুখী আলোচনা


পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য নেয়ামত ও বরকত বৃদ্ধির এক অসাধারণ এবং পরীক্ষিত সূত্র বলে দিয়েছেন। মানুষের স্বভাব হলো সে যা পেয়েছে তার চেয়ে বেশি পেতে চায়। আর এই বেশি পাওয়ার চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে 'কৃতজ্ঞতা' বা 'শুকরিয়া' আদায়ের মধ্যে。

وَاِذْ تَاَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَاَزِيْدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ اِنَّ عَذَابِيْ لَشَدِيْدٌ

অর্থ: "স্মরণ কর, যখন তোমাদের প্রতিপালক ঘোষণা করেন, যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদের জন্য (আমার নি‘য়ামাত) বৃদ্ধি করে দেব, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও (তবে জেনে রেখ, অকৃতজ্ঞদের জন্য) আমার শাস্তি অবশ্যই কঠিন।"
— (সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ৭)

আয়াতের শিক্ষা ও তাৎপর্য

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে দুটি বিষয়ের কথা বলেছেন:

  • ১. কৃতজ্ঞতার ফল: নেয়ামত বৃদ্ধি।
  • ২. অকৃতজ্ঞতার পরিণতি: কঠিন শাস্তি এবং নেয়ামত ছিনিয়ে নেওয়া।

আমরা অনেক সময় জীবনে কী নেই, তা নিয়ে এত বেশি হতাশ থাকি যে, আল্লাহ আমাদের কী কী অমূল্য নেয়ামত (সুস্থতা, পরিবার, নিরাপত্তা, ইসলাম) দিয়েছেন, তা ভুলে যাই। অথচ, প্রাপ্ত নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করলে আল্লাহ তা আরও বাড়িয়ে দেওয়ার ওয়াদা করেছেন।

হাদিসের আলোকে শুকরিয়া

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর সুন্নাহর মাধ্যমে আমাদের কৃতজ্ঞ হওয়ার বাস্তব শিক্ষা দিয়েছেন:

  • নেয়ামত উপলব্ধির উপায়: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "তোমরা পার্থিব বিষয়ে তোমাদের চেয়ে নিম্নস্তরের লোকদের দিকে তাকাও, উপরের স্তরের লোকদের দিকে তাকিও না। এতে আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতকে তোমাদের কাছে তুচ্ছ মনে হবে না।" (সহীহ মুসলিম)
  • 'আলহামদুলিল্লাহ' বলার ফজিলত: নবীজি (ﷺ) বলেছেন, "আলহামদুলিল্লাহ (যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর) মীযান বা আমলের পাল্লাকে পূর্ণ করে দেয়।" (সহীহ মুসলিম)
  • মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা: কৃতজ্ঞতা কেবল আল্লাহর সাথেই সীমাবদ্ধ নয়। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ হয় না।" (সুনান আবু দাউদ)

কীভাবে প্রকৃত শুকরিয়া আদায় করবেন?

ইসলামি স্কলারদের মতে, শুকরিয়া কেবল মুখে বলার বিষয় নয়; এর তিনটি স্তর রয়েছে:

  • অন্তরের শুকরিয়া: দৃঢ়ভাবে এই বিশ্বাস রাখা যে, আমার জীবনের ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ প্রতিটি অর্জন ও নেয়ামত একান্তই আল্লাহর দয়া; আমার নিজের কোনো যোগ্যতা নয়।
  • মুখের শুকরিয়া: সর্বদা সুখে-দুঃখে আল্লাহর প্রশংসা করা এবং বেশি বেশি 'আলহামদুলিল্লাহ' বলা। অভিযোগ ও হা-হুতাশ থেকে বিরত থাকা।
  • অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের শুকরিয়া: আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতকে (যেমন: চোখ, কান, হাত, অর্থ, সময়) তাঁরই সন্তুষ্টির কাজে ব্যবহার করা। চোখের নেয়ামতের শুকরিয়া হলো হারাম কিছু না দেখা; সম্পদের শুকরিয়া হলো দান করা।

পরিশেষে: আমাদের জীবন খুব ছোট। অভিযোগ করে কাটানোর চেয়ে, যা পেয়েছি তার জন্য কৃতজ্ঞ হওয়া অনেক বেশি প্রশান্তির। আসুন, আজ থেকেই আমরা অভিযোগের খাতা বন্ধ করে শুকরিয়ার খাতা খুলি।

"হে আল্লাহ! আমাদের হৃদয়কে আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতায় পূর্ণ করে দিন। আমাদেরকে আপনার সেইসব বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় আপনার শুকরিয়া আদায় করে। আমীন।"